গৌরবের ২৪ বছর- আলোকিত দক্ষিণাঞ্চলের পবিপ্রবি
গৌরবের ২৪ বছর পূর্ণ করল পবিপ্রবি। আলোকিত দক্ষিণাঞ্চলের এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উৎকর্ষতা ও বিজ্ঞানচেতনার পথপ্রদর্শক হিসেবে
মোঃ সজিব সরদার পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধিঃ গৌরব, অর্জন ও ঐতিহ্যের অনন্য অভিযাত্রায় ২৪ বছরে পদার্পণ করেছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের আমেজ, আলোকসজ্জা, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলসহ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সমন্বয়ে পবিপ্রবি আজ দক্ষিণাঞ্চলের জ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণায় অবদান এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশ ও বিদেশে নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে বর্ণাঢ্য আয়োজন-প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রশাসনিক ভবন, বিভিন্ন আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন তোরণ।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১০টায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমবেত হয়।পরে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া ও মোনাজাত এবং হলসমূহে আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত পটুয়াখালী কৃষি কলেজকে ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-এর উদ্যোগ এবং সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাব হোসেন চৌধুরী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনদের সহযোগিতায় এই ঐতিহাসিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আধুনিক অবকাঠামোর সমন্বয় দুমকি উপজেলার কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১০৭ একর জমির ওপর বিস্তৃত মূল ক্যাম্পাসটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
এখানে রয়েছে আধুনিক আবাসিক হল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, মসজিদ ও খেলার মাঠ। নীলকমল ও লালকমল লেক, কাঠের সেতু ও ফুলে সাজানো সড়ক ক্যাম্পাসকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি অনুষদের অধীনে প্রায় ৪ হাজার ৪৮০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কর্মরত রয়েছেন ২৬৫ জন শিক্ষক, ২২০ জন কর্মকর্তা ও ৪৮৯ জন কর্মচারী। রয়েছে ১০টি আবাসিক হল ও ৫৫ হাজারের বেশি বইসমৃদ্ধ আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি।

গবেষণা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সংযোগে সাফল্য-গবেষণাক্ষেত্রে পবিপ্রবি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন, বায়োচার প্রযুক্তির প্রয়োগ, মৎস্য গবেষণা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
BangFish, EcoPrawn ও Fish SAFE 2025-এর মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি বৈশ্বিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা গড়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, যিনি দক্ষিণ কোরিয়ার Kyungpook National University থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন, বলেন—
“পবিপ্রবিকে গবেষণাভিত্তিক, নৈতিক ও বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।
অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে নতুন দিগন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক একাডেমিক ভবন, নতুন ছাত্রাবাস, গবেষণা ল্যাব, মুক্তমঞ্চ ও মিনি স্টেডিয়াম। ক্যাম্পাসব্যাপী হাই-স্পিড ইন্টারনেট, ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং অটোমেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল রূপে গড়ে তোলা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও প্রশাসনের অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বচ্ছ প্রশাসন ও উন্নত আবাসন সুবিধার দাবি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন,“আমাদের লক্ষ্য পবিপ্রবিকে এমন এক আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা, যেখানে শিক্ষা হবে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানবিকতার সমন্বয়।
দক্ষিণাঞ্চলের স্বপ্ন থেকে জাতীয় গৌরবে চব্বিশ বছরের পথচলায় পবিপ্রবি প্রমাণ করেছে—দৃঢ় নেতৃত্ব, গবেষণা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে—জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে পবিপ্রবি একদিন বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।



