বেহেশতের টিকিটের কথা বলে শিরক করাচ্ছে

দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এ স্লোগানের পুনরাবৃত্তি করে সিলেট থেকে দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান

বেহেশতের টিকিটের কথা বলে শিরক করাচ্ছে

দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এ স্লোগানের পুনরাবৃত্তি করে সিলেট থেকে দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল নগরীর সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার বিশাল জনসভায় তিনি বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছর এ দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছিল। একটি দল বলেছে, তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে আরেকটি দেশ। আর এখন যারা মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ঠকাচ্ছে, আমরা দেখেছি তাদের আস্তানা কোথায়? সে জন্যই আমরা বলেছি, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।

’ তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের মানুষই আমাদের রাজনৈতিক সব ক্ষমতার উৎস। সেজন্য আমরা দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্বাস করি।

তারেক রহমান বলেন, ‘কেউ কেউ বলে, অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি। এবার একে দেখেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাদের ভূমিকার জন্য এ দেশের লাখ লাখ ভাই শহীদ হয়েছেন। লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রহানি হয়েছে।

তাদের নতুন করে দেখার কিছু নেই।’

বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভায় দেশবাসীর সাহায্য ও দোয়া কামনা করে তারেক রহমান ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। জনসভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

আগের দিন বুধবার রাতে ঢাকা থেকে বিমানে সিলেট পৌঁছান তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।

ওসমানী বিমানবন্দর থেকে তিনি সফরসঙ্গীদের নিয়ে সরাসরি হজরত শাহজালাল (রহ.) এবং পরে হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এ ছাড়া দরগাহ কবরস্থানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর কবরও জিয়ারত করেন। পরে তিনি নগরের উপকণ্ঠে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিরাইমপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে নৈশভোজে অংশ নেন। বিরাইমপুর যাতায়াতের পথে সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় জনসাধারণ তাঁকে স্বাগত জানান। সিলেটের বয়স্কদের কাছে তারেক রহমান ‘দামান’ (জামাতা) আর তরুণদের ‘দুলাভাই’। এমন মধুর আত্মীয়তায় তাঁকে বরণ করে নেয় সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ। রাতে তারেক রহমান শহরতলির বিমানবন্দর এলাকায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে রাতযাপন করেন। জনসভায় যোগদানের আগে এই হোটেলে তারেক রহমান শতাধিক তরুণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জনসভায় তারেক রহমান বলেন, বিএনপি দেশের প্রত্যেক মানুষকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু একটি দল ষড়যন্ত্র করছে। তাদের হঠকারিতা ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের ‘টেক ব্যাক’ বাংলাদেশে থাকতে হবে। আমরা দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছি। এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু ভোট ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলে হবে না, মানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

মাঠভর্তি জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন তারেক রহমান, ‘পবিত্র কাবা শরিফের মালিক কে? এই দিন-দুনিয়া, আমরা যে পৃথিবী দেখি, এই পৃথিবীর মালিক কে? এই সূর্য-নক্ষত্র যা দেখি, এর মালিক কে? বেহেশতের মালিক কে? দোজখের মালিক কে?’ তার প্রশ্নগুচ্ছের উত্তরে সবাই ‘আল্লাহ’ বলে সমস্বরে জবাব দেন। এরপর তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই সাক্ষ্য দিলেন, পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। দোজখের মালিক আল্লাহ। আরে ভাই, যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে কী দাঁড়াল? নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেব, ওই দেব বলছে, বেহেশতের টিকিট দেব, বলছে না? যেটার মালিক মানুষ নয়, সেটার কথা যদি তারা বলে, তাহলে সেটা শিরক করা হচ্ছে না? যেটার একমাত্র মালিক আল্লাহ। সবকিছুর ওপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পর কেমন ঠকানো ঠকাবে, আপনারা বুঝেন এবার।’ সিলেটের জনসভা শেষে তারেক রহমান সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন ছয়টি জেলার আরও ছয়টি স্থানে নির্বাচনি সভায় ভাষণ দেন। এর মধ্যে প্রথমে মৌলভীবাজারের শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে এবং পরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে বক্তৃতা করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘১৫-১৬ বছর ধরে আমরা দেখেছি কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, কীভাবে আমি-ডামি নির্বাচন হয়েছে, কীভাবে নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছে। এই তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।’ তারেক রহমান বলেন, বিএনপি দেশের এ অবস্থার পরিবর্তন করতে চায়। এ সময় তিনি স্লোগান ধরে বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ- সবার আগে বাংলাদেশ’। এজন্য সবাইকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সক্রিয়। দেশেবিদেশে বসে যারা ষড়যন্ত্র করছেন, তাদের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বক্তব্যের শেষে সবার কাছে ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা নবী করিম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে ইনশাআল্লাহ দেশ পরিচালনা করব। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে তারেক রহমান টানা ২২ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি সমাবেশস্থলে আসার আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় আলিয়া মাদ্রাসার ময়দান। মাঠের এক পাশে গুম ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের বসার জন্য নির্ধারিত জায়গা রাখা ছিল। তারেক রহমান জনসভার মঞ্চে ওঠার পর নেতা-কর্মীরা ‘দুলাভাই, দুলাভাই’- স্লোগানে চারপাশ মুখর করে তোলেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারম্যান হাত নেড়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। নেতা-কর্মীরা ধানের শীষ আঁকা এক রঙের টি-শার্ট, তারেক রহমানের ছবিসংবলিত গেঞ্জি, দলের ব্যানার, ফেস্টুন এবং সিলেটের বিভিন্ন জেলার দলীয় নেতাদের ছবি নিয়েও সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন।

আলিয়া মাঠের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ সময় মঞ্চে সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১১টি সংসদীয় আসনের বিএনপি ও জোটের শরিক দলের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ূন কবির, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, আরিফুল হক চৌধুরী, তাহসিনা রুশদীর লুনা, ড. এনামুল হক চৌধুরী ও এম এ মালিক, আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এ সালাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সাবেক এমপি শাম্মী আখতার, ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাওলানা আবদুর রকিব, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, বিএনপির সহ-ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, জিল্লুর রহমান জিল্লুর ও মিজানুর রহমান মিজান।

সিলেটে নির্বাচনী জনসভা শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে তিনি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্স মাঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর পার্কে এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গাউছিয়ায় সমাবেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন