ভালো হওয়ার জন্য শেকড়ে সন্ধান: সামাজিক অবক্ষয় রোধে সমন্বিত উদ্যোগের সময় এখনই
-মানুয়েল হাসদা,উন্নয়ন কর্মী: প্রতিদিন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা আশপাশের আলোচনায় আমরা এমন সব ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি, যা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। সামান্য বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা গুজবের জের ধরে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। একসময় যেখানে কাউকে কটু কথা বলার আগেও মানুষ বহুবার ভাবত, সেখানে আজ সহিংসতা যেন অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এসব ঘটনায় জড়িয়ে পড়া অনেকেই পথভ্রষ্ট, মাদকাসক্ত বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তরুণ।

অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়েই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? যদি অপরাধ সৃষ্টির মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়, তবে নতুন নতুন অপরাধী তৈরি হতে থাকবে। তাই অপরাধ দমনের পাশাপাশি অপরাধের শেকড় খুঁজে বের করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশু জন্মগতভাবে মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী বা অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক পরিবেশ এবং মূল্যবোধের ঘাটতি ধীরে ধীরে তার চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। যেমন একটি গাছের পরিচয় তার ফলে প্রকাশ পায়, তেমনি সমাজের ভালো-মন্দও মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হয়। ফলে চুরি, ছিনতাই, মাদকাসক্তি, যৌন সহিংসতা, হত্যা কিংবা অন্যান্য সামাজিক অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ধারাবাহিকতা।
বর্তমান সমাজ ক্রমেই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। আমরা অনেকেই মনে করি, নিজের পরিবার ভালো থাকলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিবেশ ও পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আপনি নিজের ঘর পরিষ্কার রাখলেও যদি চারপাশ নোংরা থাকে, তবে সেই নোংরার প্রভাব আপনার ঘরেও আসবে। সমাজের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। তাই নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পুরো সমাজকে সুস্থ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।

এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ, জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, নিজ নিজ ধর্মীয় চর্চা, অন্যের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ছোটবেলা থেকেই নেতিবাচক অভ্যাস ও আচরণের বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে।
একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—পৃথিবীর কোনো পরিবার একা একটি শিশুকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। একজন শিশুর বিকাশে পরিবার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রও সমানভাবে দায়বদ্ধ। তাই সামাজিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সম্মিলিত দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
আজ যদি আমরা সমস্যার শেকড়ে হাত না দিই, তাহলে আগামী প্রজন্ম আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। কিন্তু আজই যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব যেখানে আমাদের সন্তানরা নিরাপদ, সুস্থ ও নৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠবে। শাস্তি প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষ গড়ে তোলার বিনিয়োগ। কারণ ভালো সমাজ গড়ে ওঠে ভালো মানুষ দিয়ে, আর ভালো মানুষ গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দৃঢ় ভিত্তির ওপর।




