নাসিরনগরে ঐতিহ্যবাহী নবাব স্যার শামসুল হুদার বাড়ি বিলীনের পথে
সুজিত কুমার চক্রবর্তী স্টাফ রিপোর্টারঃসংস্কারের অভাবে নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক জরাজীর্ণ বাড়িটি বিলীনের পথে।
ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ,আইনজীবী, বিচারপতি ও সংবাদ পত্রের সম্পাদক নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি সংস্কারের অভাবে বিলীনের পথে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ গ্রামের এই বাড়িটি স্থানীয়ভাবে 'গোকর্ণ নবাব বাড়ি’ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক এই বাড়িতেই ১৮৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম কৃতী ব্যক্তি। বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রথম ভারতীয় প্রেসিডেন্ট, কলকাতা হাইকোর্টের দ্বিতীয় মুসলিম বিচারপতি এবং বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উক্ত বাড়িটির অবস্থা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালের ৩০ মে ঝড় ও ভারি বর্ষণে বাড়িটির সামনের একটি অংশ ধসে পড়ে। এরপরও এখন পর্যন্ত বাড়িটি সংস্কার বা সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা।
শামসুল হুদার বাবা সৈয়দ রিয়াজত উল্লাহ ছিলেন আরবি ও ফারসি ভাষার পণ্ডিত এবং তৎকালীন সাপ্তাহিক ‘দূরবীন’ পত্রিকার সম্পাদক। মা আলম আরা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শামসুল হুদা হযরত শাহ জালাল (র.) এর অন্যতম সঙ্গী সৈয়দ নাসিরুদ্দিন সিপাহসালার (র.) এর বংশধর ছিলেন।
মাদ্রাস থেকে ফাইনাল পাস করার পর তিনি হুগলী কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৮৮৬ সালে বি এল এবং ১৮৮৯ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ফারসিতে এম এ পাস করেন। কিছুদিন কলকাতা মাদ্রাসায় আরবি ও ফারসি ভাষার শিক্ষকতাও করেন।

১৮৮৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন শামসুল হুদা। আইনজীবী হিসেবে অল্প সময়েই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ একসময় তার শিক্ষানবিশ কেরানি ছিলেন। আত্মজীবনীতে রাজেন্দ্র প্রসাদ শামসুল হুদাকে খ্যাতিমান আইনজীবী ও মুসলিম সমাজের নেতা হিসেবে উল্লেখ করছেন।
নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বাংলা সংবাদপত্র ‘সুধাকর’ প্রকাশ করেন এবং ‘মিহির ও সুধাকর’ পত্রিকার প্রকাশনা স্বত্ব কিনে নেন। ১৮৮৯ সালে একজন ভারতীয় মুসলমানের প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘মোহামেডান অবজারভার’ কে আর্থিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি এর পরিচালনার দায়িত্বও নেন।
১৮৯৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ফেলোশিপ দেয়। ১৯০২ সালে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঠাকুর আইন অধ্যাপক’ নিযুক্ত হন। অধ্যাপনার সময় দণ্ডবিধি নিয়ে দেওয়া তার ধারাবাহিক বক্তৃতা পরে গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে আইন বিষয়ে তার খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও পুনর্জাগরণেও শামসুল হুদা সক্রিয় ছিলেন। ১৯০৪ সালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯০৯ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পরের বছর তিনি পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।১৯১২ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছর থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় শিক্ষা ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯১৭ সালের শুরুতে তিনি ওই কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ১৯১৩ সালে তিনি ‘নওয়াব’ এবং ১৯১৬ সালে ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯১৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বিতীয় মুসলিম বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন শামসুল হুদা। ১৯২১ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওই সময় ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে তাকে উচ্চ প্রতিভা সম্পন্ন মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করে বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রেসিডেন্ট পদে তার নিয়োগকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। অবিভক্ত বাংলার এই কৃতী ব্যক্তি ১৯২২ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতায় মারা যান। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।
লেখক ও গবেষক তাবেদার রসুল বকুলের ‘সৈয়দ শামসুল হুদা, জীবন ও সমকাল’ গ্রন্থে শামসুল হুদাকে সমাজসেবী ও পথনির্দেশক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজে তার অবদান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয়।নবাব শামসুল হুদার প্রপৌত্র সৈয়দ মো. আজাদ জানিয়েছেন, তার আরও দুই ভাই ছিলেন। তাদের একজন সৈয়দ মো. মালিহ নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম ভারতীয় চেয়ারম্যান ছিলেন। তার নামে নারায়ণগঞ্জে ‘এস এম মালিহ সড়ক’ রয়েছে। আরেক ভাই ব্যারিস্টার সৈয়দ মাসিহ। এই দুই ভাইয়ের উত্তরসূরিরাই ঐতিহাসিক নবাববাড়ির উত্তরাধিকারী।সৈয়দ মো. আজাদ আরও জানান, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা কারুকার্যখচিত দ্বিতল প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরে তার ছোট ভাই ব্যারিস্টার সৈয়দ মাসিহ ভবনের তৃতীয় তলার নকশা করেন। এতে বাড়িটির সৌন্দর্য আরও বাড়ে।নবাববাড়ির ভেতরে বাংলো ধরনের দালান, রংমহল ও চাতাল রয়েছে। সামনে রয়েছে বিশাল পুকুর ও শান বাঁধানো ঘাট। আছে কাছারিঘর ও খোলা মাঠ। বাড়ির সঙ্গে মসজিদ, পোস্ট অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, শতবর্ষী সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ রয়েছে খেলার মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স। দূর থেকে বাড়িটির উঁচু চূড়া এখনো আগতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।তবে অযত্ন আর অবহেলায় বাড়িটির বিভিন্ন অংশ এখন ভঙুর। ২০২০ সালে সামনের অংশ ধসে পড়ার পর তৎকালীন নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমা আশরাফী বাড়িটি পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে বিষয়টি জানানোর কথা জানিয়ে ছিলেন।স্থানীয় গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. শাহীন বলেছে, ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়িটি অবহেলায় বিলীন হওয়ার পথে। এটি রক্ষা করা জরুরি।বিদেশে বসবাসরত উত্তরাধিকারীদের একজন প্রকৌশলী নিয়ে এসে বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করে ছিলেন। তবে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।তিনি আরও জানিয়েছেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে চৈয়ারকুড়ি বাজারের উত্তর দিকে তিন রাস্তার মোড়ে নবাব স্যার শামসুল হুদার নামে একটি চত্বর নির্মাণ করা হয়েছে। সীমিত বরাদ্দের মধ্যেও তার স্মৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে।প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছাম্মৎ নাহিদ সুলতানা জানিয়েছেন, তিনি নাসিরনগরের নবাব শামসুল হুদার বাড়িটি সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলে বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাছরিন জানান, বাড়িটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় সরকারি অর্থে সংস্কারের সুযোগ সীমিত। বাড়িটি সরকারের মালিকানাধীন হলে সরকারি উদ্যোগে এর সংস্কার করা সম্ভব হত।



