নওগাঁয় এক নারীর দুই স্বামী-তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে সংসার

প্রবাসে এক স্বামী রেখে, দেশে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ চার বছর ধরে সংসার চালিয়ে যাবার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে

নওগাঁয় এক নারীর দুই স্বামী-তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে সংসার

এ.বি.এস রতন স্টাফ রিপোর্টার:প্রবাসে এক স্বামী রেখে, দেশে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ চার বছর ধরে সংসার চালিয়ে যাবার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকায়। অভিযুক্ত ঐ নারীর নাম মাহফুজা বেগম। তিনি আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের কিতমত জাতপাড়া গ্রামের আয়েত আলী মন্ডলের মেয়ে।

বিবাহ রেজিস্ট্রি সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ওই নারী তার প্রথম স্বামী সান্টু রহমানকে তালাক দেন। এবং একই বছরের ১৪ মার্চ তিনি কাজী অফিসে ৩৩ লাখ টাকা দেনমোহরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সামছুল আলমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামী কর্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় স্বামী সামছুল আলম প্রবাসে থাকার সুযোগে ওই নারী পুনরায় নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকায় বন্ধন টাওয়ারের তৃতীয় তলায় তার তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টুর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় চার বছর ধরে তারা একই ছাদের নিচে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এ ধরনের সম্পর্ক অবৈধ। সম্প্রতি এই ঘটনাটি আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

তথ্য অনুসন্ধানে জানাগেছে, নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের কিতমত জাতপাড়া গ্রামের আয়েত আলী মন্ডলের মেয়ে মাহফুজা বেগম প্রায় দুই যুগ আগে একই জেলার রাণীনগর উপজেলার পারইল ইউনিয়নের বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের আহাদ আলীর ছেলে সান্টু রহমানের সঙ্গে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তাদের এক ছেলে সন্তান রয়েছে। ছেলের লেখাপড়ার সুবিধার্থে মাহফুজা বেগম বগুড়া শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

সংসার চলাকালীন সময়ে ২০১৩ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রফিকুল হাসান জনির মাধ্যমে আমেরিকা প্রবাসী গাইবান্ধার ঝিলপাড়া গ্রামের মৃত. আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে সামছুল আলমের সঙ্গে মাহফুজা বেগমের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন কাজের সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পরে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১৪ মার্চ মাহফুজা বেগম তার প্রথম স্বামী সান্টু রহমানকে তালাক দেন এবং নওগাঁর একটি কাজী অফিসে ৩৩ লাখ টাকা দেনমোহরে আমেরিকা প্রবাসী সামছুল আলমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরপরই সামছুল আলম পুনরায় আমেরিকায় ফিরে যান। এরপর থেকে প্রবাসী স্বামীর কাছ থেকে নিয়মিত সংসার খরচের টাকা নিতে থাকেন মাহফুজা বেগম।

তথ্য অনুসন্ধানে আরো জানাযায়, দ্বিতীয় স্বামী বিদেশে থাকার সুযোগে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের সঙ্গে গোপনে পুনরায় সংসার শুরু করেন মাহফুজা বেগম। তারা নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় এলাকার বন্ধন টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে পরিবারিকভাবে বসবাস করছেন তারা।

ঐ ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের থেকে জানাযায়, গত চার বছর ধরে মাহফুজা ও সান্টু একই ছাদের নিচে সংসার করে আসছেন।

অন্যদিকে, প্রবাসী সামছুল আলম আমেরিকায় অবস্থানকালে তার প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের কাছে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি গোপন করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। তবে তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলে স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও সন্তানদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পারিবারিক চাপে সামছুল আলম স্বীকার করেন যে, তাকে দেশে নওগাঁর এক নারীর সঙ্গে ফাঁসিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর ২০২১ সালে দেশে এসে প্রবাসী সামছুল আলমের স্ত্রী রোকেয়া বেগম প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

মামলায় মাহফুজা বেগম, সান্টু রহমান, কুষ্টিয়ার মোহনপুর গ্রামের সেলিম রেজা, জনিসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রেক্ষিতে জনিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

মামলার বাদী রোকেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে তার স্বামীর কাছ থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়েছেন মাহফুজা বেগম। এখনও প্রতি মাসে সংসার খরচ ও অন্যান্য খাতে নিয়মিত টাকা নিচ্ছেন তিনি। সেই টাকায় বর্তমানে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের সঙ্গে ঘর-সংসার করছেন বলে অভিযোগ করেন রোকেয়া বেগম।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, অভিযুক্ত ঐ নারী মাহফুজা বেগম ও তার প্রাক্তন স্বামী সান্টু প্রায় দেড় বছর আগে শ্বাশুড়ির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে তারা একসঙ্গে যান। ওই সময় তাদের ঘনিষ্ঠভাবে একসাথে চলাফেরা করতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কানাঘোষার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এলাকাবাসী কৌশলে তাদের ছবিও ধারণ করেন। শুধু গ্রামেই নয়, শহরের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের একসাথে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বন্ধন টাওয়ারের কেয়ারটেকার তপু জানান, গত চার বছর ধরে তিনি তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে সেন্টু ও মাহফুজা দম্পতিকে বসবাস করতে দেখছেন।

এ বিষয়ে মাহফুজা বেগমের মন্তব্য জানতে তারে মুঠোফোনে বার বার কল করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তারে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী সান্টু রহমানের মন্তব্য জানতে চাইলে উল্টো নানান প্রশ্ন জুড়ে তিনি বলেন, আমি কি আপনাকে চিনি ? আমার ফোন নং কোথায় পেয়েছেন ? আমি কেন কথা বলব ? অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন- কে অভিযোগ করেছে তার নাম ঠিকানা দেন। তার কাছে কি আমার ফোন নং নাই তারে বলেন আমাকে ফোন দিতে। চেনা-জানা ছাড়া কারো কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননা তিনি।

জানতে চাইলে সকল বিষয় অস্বীকার করে প্রবাসে থাকা সামছুল আলম মুঠোফোনে বলেন, এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট। আমার সাবেক স্ত্রী এসব অপপ্রচার করছে। তবে মাহফুজার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। আর আমার টাকা আমি যাকে খুশি তাকে দিবো।

রানীনগর উপজেলার পারইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুর রহমান ২০২৩ সালে সান্টু ও মাহফুজার একটি বৈবাহিক সনদপত্র প্রদান করেন। তিনি জানান, তারা বর্তমানে একসাথেই ঘর-সংসার করে বসবাস করছেন। তাদের পরিচিত নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় ইউপি মেম্বারের স্বাক্ষর নেওয়া আছে প্রত্যয়নে। সান্টু ও মাহফুজ স্বামী-স্ত্রী। তারা এখনও স্বামী স্ত্রী হিসেবে গোস্তহাটির মোড়ে থাকছে। তবে তালাক ও দ্বিতীয় বিয়ের সম্পর্কে কিছু যানেন না তিনি।

নওগাঁর আইনজীবী আতাউর রহমান জানায়, বিভিন্ন ধর্ম ও দেশের আইনে বহুবিবাহ নিয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। অধিকাংশ ধর্ম ও আইন অনুযায়ী একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকা নিষিদ্ধ। ইসলামে পুরুষদের সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে একাধিক স্বামী রাখা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করা অবৈধ। এ ধরনের বিবাহ দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে।